Sweet Memories- Part Two

মারজান আপুকে ‘টারজান আপু’ বলে ক্ষেপাইতাম। চোখ পাকিয়ে তাড়া করত। আদর করত আমাদেরকে। পূরবীর ভাই রনি ভাইয়াকে ভয় পেতাম, যেই জোড়ে বল করে; গায়ে লাগলে চিৎপটাং। ওনার থেকে দূরে থাকাই শ্রেয়। ক্রিকেটার না এরকম মানুষও যে এত জোড়ে বোলিং করতে পারে সেটা ওনাকে দেখেই বিশ্বাস হয়েছিল।
ক্রিকেটের প্রেমে পড়ার আগে আমার অন্যতম প্রিয় খেলা ছিল ‘দড়িলাফ’। দিব্যি লাফাতাম। একবার তো ক্লাসের মেয়েদের চ্যালেঞ্জ করে বসলাম, বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় দড়িলাফে যদি মেয়েদের সাথে ছেলেরাও অংশ নিতে পারে তাহলে আমিই ফার্স্ট হব। বৃষ্টি ছাড়া ফুটবল খেলা হত না। আমাদের মাঠটা উঁচুনিচু- এবড়োথেবড়ো ছিল। ফুটবল খেলার উপযোগী না।


ছোট্ট একটা কলোনি। বড়জোর তিন-চারশো মানুষের বাস। সবাই সবাইকে চেনে। মূল কাপ্তাই থেকেও অনেকটা দূরে। একরকম বিচ্ছিন্ন একটা এলাকা। বাজার-ঘাট নেই, ঘর থেকে বের হলেই রাস্তা ভর্তি মানুষজন নেই, অন্ধকারে সাপখোপের ভয়- তারপরও একটা অচেনা ভাললাগা কাজ করত। এখনও করে।

প্রতি শুক্রবার লেকে সাতার কাটতাম আমরা সবাই। নিয়ম হয়ে গিয়েছিল। সাঁতরে একটু দূরের টিলাটায় কে সবার আগে পৌঁছতে পারে তার প্রতিযোগিতা চলত। বড় ভাইয়া গুলো পাঁজি ছিল খুব। বিশেষ করে মুবিন ভাই। সুযোগ পেলেই পানিতে চুবাতো। ওনার যে গাট্টা গোট্টা শরীর, ধরতে পারলে রক্ষা নাই।

নায়কদের মাথার চুল দাঁড়িয়ে থাকে, আমাদেরটা থাকেনা ক্যান? চিন্তার বিষয়। রিপু (রিপন) আবিষ্কার করল, ভ্যাসলিনের সাথে পানি মিশিয়ে চুলে দিলে চুল শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। বাহ! কি মহান আবিষ্কার। ওকে দিয়েই হবে।  

রোজার মাসে তারাবির সময় চলত লুকোচুরি খেলা। কলোনির সব ছেলে মিলে খেলতাম। যেহেতু অনেকজন, তাই তিন-চার জন চোর। বিশাল এলাকা জুড়ে আমাদের লুকানোর জায়গা। অতি সাহসী অনেকে তো সেই অন্ধকার রাতে ‘কুরুমে’ লুকাত।

মঈন ভাইয়াদের বিল্ডিঙের নিচে আমরা ক্রিকেট খেলাতাম তিন চার জন মিলে। ওনার মধ্যে কোচ কোচ ভাব ছিল। হাতে ধরে খেলা শিখাত। ওই বিল্ডিঙের একতলায় থাকতো রঞ্জু ভাইয়া আর তার ছোট ভাই সঞ্জু। সঞ্জু আমাদের চেয়ে দুই তিন বছরের ছোট। বিশাল চাপাবাজ ছিল। তারে দুইবার আউট করা লাগত। প্রথমবার সে কোনভাবেই ব্যাট ছাড়ত না। মঈন ভাইয়া বেশ কিছুদিন আগে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন। আল্লাহ ওনাকে জান্নাত নসিব করুন।

কামরুল ভাইয়াদের বাসায় ওনার এক খালাতো ভাই থাকতো। শাকিল ভাই। এই মানুষটাকে আমি ভয় পেতাম আবার খুব পছন্দও করতাম। কথা কম বলতেন, চাহুনির ভেতর রক্ত শীতল করা একটা ব্যপার ছিল। উনিও অবশ্য আমাকে আদর করতেন। কলোনির তখনকার আমাদের বয়সি ছেলেদের মধ্যে খুব কম জনেরই ওনার ব্যক্তিগত ড্রয়ারের ভেতরটা দেখার সুযোগ হয়েছিল। আমি সেই সৌভাগ্যবানদের একজন। কত বিচিত্র জিনিস যে ছিল সেই ড্রয়ারে, ‘বান্দরের লাঠি’ পর্যন্ত ! আমাকে একবার একটা ‘ফড়িং কলম’ দিয়েছিলেন।

তখন আমার কালি ছাড়া কলম জমানোর নেশা। বিভিন্ন ডিজাইনের কলম সংগ্রহ করতাম। কালি ছাড়া। প্রতি শুক্রবার আম্মুর সাথে বাজারে যেতাম। আমার দুইটা চাহিদা ছিল। এক. দুইটা নতুন ডিজাইনের কলম, দুই. জিলাপি। সপ্তাহের বাকি দিনগুলোতে চেষ্টা করতাম বেশি বেশি লিখে কলমের কালি শেষ করে ফেলতে। তাহলে আগামি সপ্তাহে আবার নতুন কলম! আজব আজব বিভিন্ন ধরনের কলমের বিশাল সংগ্রহ ছিল। সব হারিয়ে গেছে।


হারিয়ে গেছে পুরনো বন্ধুদের মত।

আমার বয়সী সবাই আমার বন্ধু ছিল। তবে একজনের সাথে ঘনিষ্ঠতা বেশি ছিল। কাপ্তাই ছেড়ে এসেছি প্রায় দশ বছর। অনেক খুঁজেছি ওই বন্ধুকে। অন্য অনেককেই খুঁজে পেলেও ওর খোঁজ পাচ্ছিলাম না। কিছুদিন আগে পেলাম; যোগাযোগের চেষ্টা করেছিলাম। বন্ধু আমার এক্স ক্যাডেট, নামি-দামি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করে, আমি তেলাপোকার ডিম। তাই সম্ভবত সাড়া দিলো না। যাই হোক, পুরনো অনেককেই কাছে পেয়েছি আবার এটাই বা কম কিসে।